ছয় ইউনিয়নের দীর্ঘ বঞ্চনার অবসানে ‘উত্তর সাতকানিয়া’ নামেই গেজেট চান স্থানীয়রা
এনামুল হক
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া কেবল একটি উপজেলার নাম নয়, এটি একটি ইতিহাস। ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই জনপদ শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রবাসী আয় ও উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে দেশজুড়ে পরিচিত। সেই সাতকানিয়ারই উত্তরাঞ্চলের ছয়টি ইউনিয়ন— কেঁওচিয়া, বাজালিয়া, পুরানগড়, ধর্মপুর, কালিয়াইশ ও খাগরিয়া আজ নিজেদের প্রশাসনিক পরিচয় খুঁজছে ‘উত্তর সাতকানিয়া’ নামে।
স্থানীয়দের দাবি স্পষ্ট— নতুন থানা ও উপজেলা চাই, তবে নামের সঙ্গে সাতকানিয়া থাকতে হবে। তাদের যুক্তি, প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা সাতকানিয়ার পরিচয় বহন করছে। প্রশাসনিক সীমানা বদলাতে পারে, কিন্তু ঐতিহাসিক পরিচয় বদলায় না।
কেন এই দাবি?
এই ছয় ইউনিয়নের মানুষ গত ৩০ বছর ধরে এক অদ্ভুত প্রশাসনিক জটিলতায় ভুগছে। প্রশাসনিকভাবে তারা সাতকানিয়া উপজেলার বাসিন্দা, কিন্তু ১৯৯৬ সাল থেকে জাতীয় নির্বাচনে তারা ভোট দেয় চন্দনাইশ-সাতকানিয়া (আংশিক) আসনে। ফলে উন্নয়ন পরিকল্পনায় তারা না পুরোপুরি সাতকানিয়ার, না পুরোপুরি চন্দনাইশের। উপজেলা সদর থেকে ২০-২৫ কিলোমিটার দূরের এই জনপদের মানুষকে ভূমি সেবা, সরকারি সনদ কিংবা আইনি সেবার জন্য দিনের পর দিন ভোগান্তি পোহাতে হয়।
এই বঞ্চনা থেকেই জন্ম নিয়েছে পৃথক থানা ও উপজেলার দাবি।
*অতীতে কী হয়েছিল?*
২০১৮ সালে এই ছয় ইউনিয়নের সঙ্গে চন্দনাইশের দোহাজারী ও ধোপাছড়ি নিয়ে নতুন থানা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন সাঙ্গু নদীর নামে ‘সাঙ্গু থানা’ বা ‘দোহাজারী সাঙ্গু থানা’ নাম প্রস্তাব করা হলে আপত্তি তোলে ছয় ইউনিয়নের মানুষ। তারা ‘উত্তর সাতকানিয়া’ নামে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে। শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টে রিট হলে পুরো প্রক্রিয়াই থেমে যায়। অতীতের এই ভুল থেকে শিক্ষা হলো— নামকরণে জনমতকে উপেক্ষা করলে বিরোধ বাড়ে।
*নতুন আশা*
জনদাবির মুখে বিষয়টি আবার সচল হয়েছে। চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব জসিম উদ্দিন আহমদের ডিও লেটারের ভিত্তিতে গত ১০ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ছয় ইউনিয়ন নিয়ে নতুন উপজেলা গঠনের প্রস্তাব পাঠাতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে গণশুনানিও শেষ হয়েছে।
আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর) কেরানীহাটে উত্তর সাতকানিয়া উপজেলা বাস্তবায়ন পরিষদ আয়োজিত মহাসমাবেশে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে সংসদ সদস্য ঘোষণা দেন, উত্তর সাতকানিয়া উপজেলা ও থানা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ ঘোষণায় এলাকায় আনন্দের জোয়ার বইছে।
একই নামে কি থানা হয়?*
অনেকে প্রশ্ন করেন, একই নামে দুটি থানা বা উপজেলা হয় কি না? উত্তর হলো, বাংলাদেশে এর অসংখ্য নজির আছে।
চাঁদপুরে আছে মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণ, কুমিল্লায় আছে আদর্শ সদর ও সদর দক্ষিণ। সবশেষ ২০২৬ সালের ১ জুলাই নিকার সভায় অনুমোদন পেয়েছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উত্তর ও ময়মনসিংহের দক্ষিণ গফরগাঁও। থানা পর্যায়ে আছে পদ্মা সেতু উত্তর ও পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানা, ঢাকায় আছে উত্তরখান ও দক্ষিণখান, কেরানীগঞ্জ ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ। সুতরাং সাতকানিয়ার পাশাপাশি ‘উত্তর সাতকানিয়া’ নামকরণে কোনো আইনি বাধা নেই।
শেষ কথা
উত্তর সাতকানিয়া থানা ও উপজেলা গঠন এখন আর শুধু একটি প্রশাসনিক প্রস্তাব নয়, এটি সুষম উন্নয়ন, সেবা বিকেন্দ্রীকরণ এবং একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় রক্ষার আন্দোলন। সরকারের কাছে প্রত্যাশা, সকল জল্পনার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত ‘উত্তর সাতকানিয়া থানা ও উপজেলা’ নামে গেজেট প্রকাশ করে ছয় ইউনিয়নের লক্ষ মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটানো হবে।
লেখক: এনামুল হক
সেকশন অফিসার, জনসংযোগ, তথ্য ও পরামর্শ দপ্তর,
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়