হাইকোর্টের নামে ভুয়া রিটের অজুহাতে আটকে আছে বেতন চালুর ফাইল
তারাগঞ্জ শিশু কল্যাণ স্কুল অনুমোদনের ছয় বছরেও বেতন পাচ্ছেন না শিক্ষকরা
বিশেষ প্রতিনিধিঃ
অনুমোদনের ৬ বছর পরও শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা পাচ্ছে না রংপুরের তারাগঞ্জ শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়। ২০১৬ সালে বিদ্যালয়টি অনুমোদনের (বিদ্যালয় নম্বর-১৪২) পর থেকে শিক্ষাপ্রদানের মহান দায়িত্ব পালন করলেও আজ পর্যন্ত বেতন-ভাতা না পাওয়ায় জীবিকা নির্বাহ করা নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন একজন পিয়নসহ ৬ শিক্ষক। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে দেশের নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে তাদের জীবন ধারণ আরও কঠিন আকার ধারণ করছে। তারা কারও কাছে না পারেন চাইতে; না পারেন হাত বাড়াতে। নিয়মানুযায়ী বেতনÑভাতা পেতে সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে ঘুরেও কোনো কুলকিনারা পাচ্ছেন না। হাইকোর্টে ভুয়া একটি রিটের অজুহাতে দীর্ঘদিন ধরে তাদের বেতন-ভাতা চালুর বিষয়টি আটকে আছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্পতি এক অনুসন্ধানে অসহায় এসব শিক্ষকের মানবেতর জীবন-যাপনের এ চিত্র উঠে এসেছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে দ্রুত প্রাপ্য বেতন-ভাতা পেতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগিরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর তারাগঞ্জ শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা এত কিছু বুঝি না; কোর্ট-মামলা বুঝি না। আমরা কোমলমতি শিশুদের শিক্ষা দেই। আমাদের বেতন ভাতা চালু করা হোক। আমরা আমাদের পরিবার পরিজন নিয়ে চলতে পারি এটাই আমাদের একমাত্র চাওয়া।’
জানা গেছে, হাইকোর্টের নামে ভুয়া একটি রিটের অজুহাতে আটকে আছে রংপুরের তারাগঞ্জ শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের (১৪২) শিক্ষকদের বেতন। প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিশু কল্যাণ ট্রাস্টি বোর্ডের ৬৪তম বোর্ড সভায় রংপুর জেলার তারাগঞ্জ শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৪২) অনুমোদন পায়। অনুমোদিত ৪৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকগণ বেতন ভাতা না পাওয়ায় স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. মারুফ শাহ শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের ২০১৬ সালের ২৬ আগস্ট অনুমোদনের চিঠি মোতাবেক তথ্য চেয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। যে তথ্য চাওয়া হয়; তা হচ্ছে- বিদ্যালয়টির শিক্ষকগণের বেতন-ভাতা প্রদানের জন্য ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে কি না? কমিটি গঠন করা হয়েছে কিনা? ছাত্র ছাত্রীদের উপবৃত্তি দেওয়া হয় কি না?
আরও জানা গেছে, বিদ্যালয়টি ২০১৭ সালের ২৬ জানুয়ারি ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তির জন্য প্রকল্পভুক্ত করা হয়। কিন্তু ছাত্র ছাত্রীদের উপবৃত্তিও চালু হয়নি।
এদিকে তারাগঞ্জ শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিষয়ে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সব ইউনিট একত্রে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে চাহিত তথ্য না দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন নং ১৬৭২৬/২০১৭ এবং ৬৮৬/২০১৭ দায়েরের কারণে সকল কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া জেলা প্রশাসকের কাছে সঠিক তথ্য চেয়ে আপিল করলে হাইকোর্ট বিভাগের ৬৮৬/২০১৭ রিটের ৪ মাসের স্থগিতাদেশের কারণ দেখানো হয়। স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির আবেদনের প্রেক্ষিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন সমন্বয় শাখা উল্লিখিত বিষয়ে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য জেলা প্রশাসক রংপুরকে নির্দেশ দেন; কিন্তু জেলা প্রশাসন করোনার সময়ে কাউকে না জানিয়ে মনগড়া প্রতিবেদন তৈরি করে মাঠ প্রশাসন সমন্বয় শাখায় প্রেরণ করেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ৩টি রিট মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ রিটের নম্বর ও হাইকোর্ট বিভাগের ইস্যু করা কোনো আদেশ নেই।
পরবর্তীতে ৩টি ভিন্ন ধরনের প্রতিবেদন হওয়ায় চ্যালেঞ্জ করে জেলা প্রশাসকের নিকট শুনানি চেয়ে আবেদন করলে শুনানির দিন ধার্য করে চিঠি ইস্যু করেন। কিন্তু শুনানি অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের প্রতিনিধি শিক্ষা অফিসার হাইকোর্ট বিভাগের রিটের কারণে বিদ্যালয়ের বেতন বন্ধ বা কার্যক্রম স্থগিতের কোনো ইস্যু করা আদেশ দেখাতে পারেননি। শুনানির পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিবেদনও দেওয়া হয়নি।
সর্বশেষ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের বর্তমান পরিচালকের কাছে তারাগঞ্জ শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. মারুফ শাহ লিখিত তথ্য চাইলে বেতন বিল বন্ধ সংক্রান্ত আদালতের মামলা /আদেশ সম্পর্কে ট্রাস্ট দপ্তর অবহিত নয় বলে লিখিতভাবে জানিয়ে দেয় শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, হাইকোর্টের রিট দুটি অনলাইনে শুধু দেখা যায়, একই প্রতিষ্ঠানে একই বিষয়ে দুটি রিট এবং রিট দুটির একটির পক্ষ হিসেবে দেখানো হয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবকে, অপরটিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবকে দেখানো হয়। তা হবার কথা নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। আর হাইকোর্ট বিভাগের ইস্যু করা কোনো আদেশের কোনো ডকুমেন্ট অনলাইনে দেখা যায়নি। এমনকি অনলাইনে এ জাতীয় জাজমেন্ট ও অর্ডারের কোন তথ্য আপলোড হয়নি কিংবা দেখা যায়নি। আর বাস্তবেও কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের পরিচালকের চাহিত তথ্যের দেওয়া লিখিত প্রতিবেদনেই উৎকৃষ্ট প্রমাণ।
এ বিষয়ে তথ্য চাওয়া আবেদনকারী স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. মারুফ শাহ প্রতিবেদককে শিক্ষকদের বেতন না পাওয়ার কথা জানান। তিনি বলেন, শিক্ষকদের সঙ্গে ২০১৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের সাবেক পরিচালক এবং বর্তমান কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে সেখানে উপস্থিত সহকারী পরিচালক মো. মাহবুবুর রাব্বানী জানান ‘স্কুলটির নামে মামলা আছে এর জবাব আদালতে দাখিল করেছি। তখন সাবেক পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘হাইকোর্ট বিভাগের মামলার ক্লিয়ারেন্স নিয়ে আসেন আমি বেতন চালু করে দেবো।’ তবে স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হাইকোর্টের ইস্যু করা কাগজপত্র চাইলে তিনি তাকে তা না দিয়ে এড়িয়ে যান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারাগঞ্জ শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসরিন নাহার প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরা বেতন-ভাতা পাচ্ছি না। শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তির টাকাও পাচ্ছে না। আমি কখনো মামলা করিনি। মামলা সম্পর্কে কোনো কিছুই জানা নেই।’ নাসরিন নাহার আরও বলেন, ‘বিদ্যালয়টি অনুমোদন পেয়েছে শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট কর্তৃক সরেজমিনে পরিদর্শনের রিপোর্টের ভিত্তিতে। পরিদর্শন রিপোর্টে বিদ্যালয়ের সমস্ত তথ্য রয়েছে। এখানে কেউ প্রধান শিক্ষক দাবি করেছেন কিনা আমার জানা নেই।’
এ বিষয়ে শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের বর্তমান সহকারী পরিচালক মো. মাহবুবুর রাব্বানী বলেন, ‘মামলা সম্পর্কে আমি কিছু বলতে পারবো না। এ ব্যাপারে পরিচালক স্যারের সাথে কথা বলেন। আমার বাড়ি রংপুরে।
এ বিষয়ে রংপুরের জেলা প্রশাসক ড. চিত্রলেখা নাজনীন আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। বিষয়টি আমি দেখবো।’
এ বিষয়ে শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের পরিচালক বর্তমান আবুল বশার আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, ‘২০১৬ সালে বিদ্যালয়টির অনুমোদনের চিঠি ইউএনওর কাছে পাঠিয়ে দেয়। তখন ইউএনওর কাছে ৩ ব্যক্তি প্রধান শিক্ষক হিসেবে দাবি করলে ব্যাংক হিসাব ও কমিটি গঠনের কাজ বন্ধ করে দেয়। তিনি বলেন, স্কুলটির বেতন বন্ধ রাখা হয়নি, যেখানে চালুই হয়নি সেখানে কিভাবে বন্ধ রাখা হয়? আবুল বশার আরও বলেন, মামলা সম্পর্কে বক্তব্য দিবেন না, এটা ওই তিনজন দাবি করা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পরস্পর পরস্পরের ওপর মামলা।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের তৎকালীন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ও বর্তমান সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) প্রবীর কুমার হালদার স্কুলটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। তার পরিদর্শনের ভিত্তিতে ৬৪তম বোর্ড সভায় বিদ্যালয়টি অনুমোদন পায়। তাহলে অনুমোদনের পর তিনজন দাবি করলো কীভাবে? পরিচালকের বক্তব্য মনগড়া মনে হচ্ছে। প্রধান শিক্ষকের দাবির সঙ্গে স্কুলের ব্যাংক হিসাব খোলা এবং কমিটি গঠনের সম্পর্ক কি? সঠিক প্রধান শিক্ষক তারা ৭ বছরেও নির্ণয় করতে পারেনি। ওই বোর্ড সভায় ৪৬টি স্কুলের অনুমোদন হয়। ৪৫টি বেতন পায়, একটা স্কুল না পাওয়ার বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত করলে কেঁচো খুঁজতে সাপ বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা ৷