রাজউকে ঘুষ সিন্ডিকেট: পরিদর্শক সাইদুলের বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুদক যদি এই অভিযোগের ভিত্তিতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান চালায়, তবে পরিদর্শক সাইদুলের আরও অনেক অজানা অবৈধ সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসবে।
মতিঝিল (ঢাকা): রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) উত্তরা জোনাল অফিসের পরিদর্শক মো. সাইদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও ক্ষমতা অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ দাখিল করা অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, রাজউকের এস্টেট শাখায় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করে তিনি কয়েক বছরেই শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর মো. মোবারক হোসেন নামে এক ব্যক্তি পরিদর্শক সাইদুলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগটি দুদকে দাখিল করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই সরকারি কর্মকর্তা বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন এবং তার সম্পদের পরিমাণ বৈধ আয়ের সঙ্গে একেবারেই অসংগতিপূর্ণ।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে সাইদুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগগুলো তুলে ধরা হয়েছে। দীর্ঘদিন রাজউকের এস্টেট শাখায় থাকার সুবাদে সাইদুল একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি ঘুষ-বাণিজ্য চালাতেন, যেখানে সাধারণ গ্রাহকরা চরমভাবে অতিষ্ঠ ছিল। অভিযোগ, চুক্তি মোতাবেক বিপুল অর্থ ছাড়া কোনো ফাইলের অগ্রগতি হতো না।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, রাজউকের প্রধান কার্যালয়ের এস্টেট শাখার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করেই তিনি এই অবৈধ কাজগুলো সম্পন্ন করতেন। এমনকি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কয়েকজন আমলার সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্পদের বিবরণীতে কয়েক বছরের সরকারি চাকরিতে অবৈধ উপায়ে এই পরিদর্শক শত কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার সম্পদের মধ্যে রয়েছে। দক্ষিণখানে তিন কাঠার ওপর বাড়ি নির্মাণ, যার আনুমানিক মূল্য কয়েক কোটি টাকা। গাজীপুরে পাঁচ কাঠার প্লট। গ্রামের বাড়িতে বিঘায় বিঘায় সম্পত্তি ও কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল বাড়ি। পূর্বাচলে শেয়ারে পাঁচ কাঠার প্লট ক্রয়।
অভিযোগে বলা হয়, পরিদর্শক সাইদুলের চলাফেরা কোনো বিত্তশালীর চেয়ে কম নয়। তার দামি পোশাক-আশাক ও ঘড়ি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এই অভিযোগের বিষয়ে পরিদর্শক সাইদুল ইসলাম তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি জোর দিয়ে দাবি করেন যে, তিনি নিয়মিত সরকারকে আয়কর পরিশোধ করেন এবং এর বাইরে তার কোনো অবৈধ সম্পদ নেই।
তিনি পাল্টা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেন, “যদি কেউ আমার টঙ্গী, উত্তরা বা বাড্ডার মতো স্থানে বাড়ির দাবির প্রমাণ দিতে পারে, তবে আমি শাস্তি মাথা পেতে নেব। অন্যথায় অভিযোগকারীদের লিখিতভাবে ভুল স্বীকার করতে হবে।… ৩১ বছরে কি আমি কিছুই করতে পারি না? আমি কি সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছি?”
যদিও তিনি উত্তরা, টঙ্গী বা বাড্ডায় কোনো বাড়ির কথা অস্বীকার করেন, কথোপকথনে তিনি দক্ষিণখানে তার একটি প্লট থাকার কথা স্বীকার করেন। তবে সেই প্লটের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি বলেন, “একটা প্লটের কয় টাকা দাম?” সরকারি চাকরির সীমিত আয়ে বিপুল সম্পদ গড়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পদের মূল্যবৃদ্ধির যুক্তি দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের চোখকে জানান, এই ধরনের অবৈধ সম্পদ অর্জনের ঘটনা সত্য। তিনি বলেন, “আসলে যারা চাকরি করেন, তারা এসব কাজে জড়িত থাকে এবং এই অবৈধ সম্পদ করে—এটা সত্য। শুধু চাকরি করে ঢাকা শহরে থাকা এবং যাতায়াত করতে সেই টাকা হয় না। তাছাড়া ঢাকা শহরের মধ্যে প্লট, ফ্ল্যাট, এত সম্পদ করা তো অবৈধ টাকার সম্পদেই হবে। ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে এটা তো বোঝাই যায়। কেউ শিকার নাও করুক, তারপরও মানুষ এই বিষয়ে বুঝেন, জানেন।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুদক যদি এই অভিযোগের ভিত্তিতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান চালায়, তবে পরিদর্শক সাইদুলের আরও অনেক অজানা অবৈধ সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসবে।